মাকে কাঁধে করে নিয়ে জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ করলো দুই সন্তান। নীলকুরিঞ্জি ফুল নিজের চোখে দেখার ইচ্ছা।

Mother Son Love: প্রতি ১২ বছরে একবার ফোটা নীলকুরিঞ্জি ফুল নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে ছিল ৮৭ বছরের এক মায়ের। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে, শেষ ১.৫ কিলোমিটার খাড়া পাহাড়ি রাস্তা কাঁধে করেই তাঁকে তুলে নিয়ে গেলেন তাঁর দুই ছেলে। কেরলের এই বাস্তব ঘটনা আজও অগণিত মানুষকে আবেগে ভাসায়।

কেরলের কোট্টায়াম জেলার মুত্তুচিরা গ্রামের বাসিন্দা এলিকুট্টি পলের বয়স তখন ৮৭ বছর। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসের এই ঘটনা আজ, ২০২৬ সালেও, মানুষের মনে একইরকম আবেগ জাগায়। কারণ এটি কোনও বড় মঞ্চের গল্প নয়, বরং দুই ছেলের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বাস্তব ছবি। বার্ধক্যের কারণে এলিকুট্টির পক্ষে আর দীর্ঘ পথ হাঁটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তাঁর মনে বহুদিন ধরে একটি ইচ্ছে রয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমঘাটের পাহাড়ে ফুটে ওঠা বিরল নীলকুরিঞ্জি ফুল অন্তত একবার নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না, কারণ এই ফুল প্রতি ১২ বছরে মাত্র একবার ফোটে। তাই ২০২২ সালের সেই প্রস্ফুটনই হয়তো তাঁর জীবনের শেষ সুযোগ হতে পারত।
মায়ের সেই ইচ্ছার কথা জানার পর দুই ছেলে রোজান ও সাথ্যান আর দেরি করেননি। তাঁরা কোট্টায়াম থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ জিপে করে ইদুক্কি জেলার মুন্নারের কাছে কল্লিপাড়া পাহাড়ের উদ্দেশে রওনা দেন। পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত গাড়িতে পৌঁছলেও, সেখান থেকে আর কোনও মোটরচালিত রাস্তা ছিল না। শেষ প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পথ ছিল খাড়া উঁচু পাহাড়ি ট্রেকিংয়ের রাস্তা। একজন ৮৭ বছরের বৃদ্ধার পক্ষে সেই পথ পায়ে হেঁটে ওঠা কার্যত অসম্ভব ছিল। কিন্তু মায়ের স্বপ্ন পূরণ না করে ফিরে যাওয়ার কথা দুই ভাই একবারও ভাবেননি।
রোজান ও সাথ্যান পালা করে নিজেদের কাঁধে মাকে তুলে নেন। একজন কিছুটা পথ এগিয়ে গেলে অন্যজন আবার দায়িত্ব নিতেন। অসমান পাথর, উঁচু চড়াই আর ক্লান্তিকর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে তাঁরা ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের সমস্ত পরিশ্রমের লক্ষ্য ছিল একটাই—মা যেন নিজের চোখে সেই নীলচে-বেগুনি নীলকুরিঞ্জির বিস্তীর্ণ সৌন্দর্য দেখতে পারেন। অবশেষে পাহাড়ের উপরে পৌঁছে এলিকুট্টি পল চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বিরল ফুলের সমুদ্রের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। বহু বছরের অপেক্ষার অবসান হয় সেই মুহূর্তে।

আরও পড়ুনঃ ২১ বয়সী শ্রী চরণীর সাফল্যের রহস্য কী? মহিলা বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স।

সেখানে উপস্থিত কয়েকজন পর্যটক এই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করেন। পরে সেগুলি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের নজর কেড়ে নেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ দুই ভাইয়ের এই ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রশংসা করেন। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের আধুনিক শ্রবণ কুমারের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে সেটি ছিল মানুষের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া, কোনও সরকারি বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়।
নীলকুরিঞ্জি পশ্চিমঘাটের অন্যতম বিরল ফুল, যা প্রতি ১২ বছরে মাত্র একবার প্রস্ফুটিত হয়। সেই কারণেই ২০২২ সালের এই ঘটনাটি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি। ২০২৬ সালেও দুই ভাইয়ের সেই পাহাড়ে ওঠার ছবি ও গল্প বারবার ফিরে আসে মানুষের সামনে। কারণ এখানে কোনও অসাধারণ শক্তির গল্প নেই, আছে শুধু দুই ছেলের কাঁধে ভর করে ৮৭ বছরের এক মায়ের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ